Monginis chocolates and Fascism/ মনের জিনিস মনজিনিস ও ফ্যাসিবাদ

Did you know that Monginis, the iconic Indian cake shop, was founded in Bombay in 1902 by two Italian brothers? A hundred years ago around this time of year, the Mongini brothers would be wrapping up their elaborate Easter Bazaar at their store on Churchgate Street in Bombay.

Discovering an unexplored private archive is many a historian’s dream. In July 2016 a friend in Mumbai, Simin Patel, opened the doors of a treasure trove for me- her family’s trunk of old papers, postcards, picture books and assorted memorabilia. Among the first things in that trunk to catch my eye was this old box from Mongini Ltd.

Monignis box

Though I have grown up on a steady diet of Monginis birthday cakes for several years of my life, it never occurred to me to think that not only might the name “Monginis” be of Italian origin, but also that the company might be more than a hundred years old!

So I racked through old articles of the Times of India to learn more about the company. Turns out that in 1902 Messrs. Mongini opened their restaurant and confectionery on Churchgate Street in Bombay as Mongini Ltd. In 1919, following a widening of Churchgate street, they reopened their new and larger building as the Mongini Brothers. The TOI reported that “Messrs. Mongini’s building will prove a valuable addition to the palatial business establishments of the city… The ground floor will be used as Refreshment room and confectionery. The dining room will be located on the first floor. Whilst the 2nd floor may be reserved and arrangements made for wedding receptions, dinner parties, presentation ceremonies and so on.” (TOI, Mar 21 1919).

Monginis Christmas

The Times of India, 6 December 1929. Courtesy ProQuest Historical Newspapers.

So not only was Mongini’s famous for its cakes, it was also a place for Bombay’s European and later Indian elite to have dinner while listening to classical music, hold meetings, book clubs and all manner of cultural and business soirees. In the 1930s Mongini’s became quite famous for its Hungarian orchestra, directed by Laszlo Szabo and played by Hungarian musicians. There were concerts on Tuesdays, dinner dances on Fridays and Saturdays and as the TOI said, Mongini’s was quite the “favoured haunt at afternoon and evening of the city’s socialites, intelligentsia and business bosses.” The chocolates and cakes were of course special, particularly on the occasion of the annual Easter and Christmas Bazaars. Several TOI articles describe the crackers and chocolates of all sizes and descriptions piled high, alongside sweets both freshly made and imported like marrons, crystallized fruit, sugar coated almonds, caramels, toffees, wafers, Easter eggs, gauzy butterflies and black cats for table decorations, and the bakery making fresh Christmas cakes to be sent all over India.

What is less known perhaps is that L. U. Mongini, one of the founding brothers of the company, was a proud fascist who wrote several letters to the Times of India praising “the immense services rendered by Mussolini to Italy” and explaining how “Fascism [had] saved Italy” from the disaster that was Communism in his opinion. Mr. Mongini was a member of the Bombay Presidency Trades Association, Consul for the Italian Touring Club of Bombay (which seems to have promoted tourism in Italy), and Director of the Fascism centre in Bombay founded in 1925.

Monginis Easter

The Times of India, 29 March 1929. Courtesy ProQuest Historical Newspapers.

While debating the benefits of Fascism with another reader of the newspaper he wrote quite frankly, “if on the one hand Fascism insists on discipline and places restrictions on so-called liberty, on the other hand it creates order and economic balance in the State.” He had no qualms admitting that Fascism curtailed the freedom of the press, freedom of assembly and the right to strike, because it protected the regime from sedition and defamation by giving it a “firm strong hand”. Besides, Fascism for him was more than just a party, it “[identified] itself with the nation… It [was] the Italian nation itself.”

Though none of the letters by L.U. Mongini to the press on the subject of Fascism ever mentioned Mongini Ltd., we know that it is the same Mr. Mongini because the address from which he signed his letters was that of the shop (45 Church Gate Street). Thus the man who supplied sweet delights to elites all over India and Bombay was also the man who thought Mussolini and a “strong regime” was the answer to Italy’s troubles. Following the turns of history and the outcome of the Second World War, fascism and Mussolini may no longer be things to be openly proud of. But there was a time when even moderates thought Mussolini had made great contributions to Italy, as even the man debating with Mr. Mongini over Fascism conceded. For Mr. Mongini, and many others of his time, these were all things to take pride in- the strength and supremacy of the nation, the squashing of all criticism of Fascist violence as “defamation” and “seditious propaganda”, and abolishing civil and workers liberties to strengthen “the Kingdom of Fascism and its Duce.”

Monginis (now Mio Amore in Kolkata) no longer has anything to do with Italy or Fascism of course. Ownership passed to Indian hands and the brothers left the country at the time of Independence. But as you buy your next chocolate cake or eat an Easter egg anywhere in the world this season, it’s worth wondering- do you know people who believe in similar things today? And if so, who are the Il Duces of our times?

Monginis orchestra

The Times of India, 13 March 1934. Courtesy ProQuest Historical Newspapers. 


ভারতবর্ষের সুপরিচিত কেকের দোকান মনজিনিসের জন্ম কোথায় জানেন? ১৯০২ সালে বম্বে শহরে দুই ইটালিয়ান ভাইয়ের হাতে। একশ বছর আগে ঠিক এরম সময়, মনজিনি ব্রাদার্সের চার্চগেট স্ট্রীটের দোকানে গেলে একটি বিরাট ইস্টার বাজার দেখতে পেতেন।

ঐতিহাসিক গবেষণার পথে কোন ব্যক্তিগত আর্কাইভ খুঁজে পাওয়া অনেক ইতিহাসবিদেরই স্বপ্ন। ২০১৬ সালের জুলাই মাসে এক বন্ধু, সিমিন পাটেলের কৃপায়, আমার সেই স্বপ্ন পূর্ণ হয়। তার পরিবারের পুরনো একটি ট্রাঙ্কে প্রচুর ছবি, পোস্টকার্ড, খবরের কাগজ ইত্যাদির সন্ধান পাওয়া যায়। সেই ট্রাঙ্ক খুলতেই প্রথমে আমার চোখ গিয়ে পড়ে এই মনজিনিসের বাক্সটির উপর।

Monignis box

সমস্ত ছোটবেলা জন্মদিনে মনজিনিসের কেক খাওয়া সত্ত্বেও কোনদিন চিন্তা করিনি যে “মনজিনিস” নামটি হয়ত মূলত ইটালিয়ান। এমনও ভাবিনি যে কোম্পানিটির বয়স একশ বছরেরও বেশি!

তাই টাইম্‌স অফ ইন্ডিয়ার প্রায় একশ বছর পুরনো সংখ্যাগুলি ঘেঁটে তদন্তে নেমে পড়ি। কাগজ পড়ে জানলাম যে প্রথম ১৯০২ সালে দুই মনজিনি ভাই বম্বের চার্চগেট স্ট্রীটে মনজিনি লিমিটেড নামে একটি রেস্টোরেন্ট ও মিষ্টির দোকান উপস্থাপনা করেন। ১৯১৯ সালে, রাস্তা চওড়া করার কাজ সম্পূর্ণ হওয়ার পর তাঁরা নতুন করে আরো প্রশস্ত রূপে মনজিনি ব্রাদার্স নামে দোকানটি খোলেন। টাইম্‌স অফ ইন্ডিয়ার কাগজে খবর বেরয় যে “মনজিনি মহাশয়দের দোকানটি এই শহরের প্রাসাদতুল্য ব্যবসায়ী সংস্থার দলে একটি মূল্যবান সংযোজন। ইমারতটির এক তলায় খাবার ও মিষ্টির দোকান হবে। দু তলায় খাবারের ঘর বা ডাইনিং রুম হবে। এবং তিন তলায় বিয়ের আসর, ভোজন, বা বিভিন্ন অনুষ্ঠানের উদ্দেশ্যে ঘর ভাড়া করার ব্যবস্থা করা হবে।” (২১ মার্চ ১৯১৯)

Monginis Christmas

টাইম্‌স অফ ইন্ডিয়া, ৬ ডিসেম্বার ১৯২৯.

অর্থাৎ সেই সময় মনজিনির খ্যাতি কেবল মাত্র কেকের সূত্রে নয়, বম্বের ইউরোপীয় এবং ভারতীয় অভিজাত ব্যক্তিদের ক্লাসিক্যাল সঙ্গীত সহ ডিনার পার্টি, বৈঠক ইত্যাদি নানান রকমের আসরের আদর্শ ঠিকানা হিশেবে ছিল। ১৯৩০-এর দশকে মনজিনির লাস্লো সাবো দ্বারা পরিচালিত হাঙ্গেরিয়ান অর্কেস্ট্রার সুনাম বাড়ে। প্রতি মঙ্গলবার কন্সার্ট এবং শুক্রবার ও শনিবার সান্ধ্যভোজন ও নাচের অনুষ্ঠানের প্রথা চালু করা হয়। টাইম্‌স অফ ইন্ডিয়ার ভাষায় মনজিনি “দুপুর ও সন্ধ্যা বেলায় শহরের বুদ্ধিজীবী, ব্যবসা নেতা ও বিশিষ্ট ব্যক্তিদের পছন্দের আড্ডা” হয়ে ওঠে। চকলেট ও কেকের খ্যতি তো অবশ্যই ছিল, বিশেষত মনজিনির বার্ষিক ইস্টার ও বড়দিনের বাজারগুলিতে। খবরের কাগজের প্রবন্ধে দোকানে সাজান নানান আকার-প্রকারের রাশীক্রিত চকলেট ও পটকার বিবরণ পড়া যায়, তাদের পাশে বিভন্ন রকমের মিষ্টি, কিছু টাটকা তৈরি, কিছু আমদানি করা- ফরাসি মধুমাখা চেস্টনাট, বাদাম ও ফল, ক্যারামেল, টফী, বিস্কুট, ইস্টারের ডিম, সূক্ষ্ম কাগজের প্রজাপতি, কালো বিড়ালের পুতুল ইত্যাদি নানান প্রকারের টেবিলের সজ্জা, এবং সমস্ত দেশে পাঠানোর জন্য স্থানীয় বেকারিতে তৈরি বড়দিনের কেক।

তবে মনজিনি ব্রাদার্সের অন্তত এক ভাই যে গর্বিত ফ্যাসিস্ট ছিলেন সেই বিষয়টি অনেক কম আলোচিত। এল.ইউ.মনজিনি টাইম্‌স অফ ইন্ডিয়ার কাগজে “ইট্যালির জন্য মুসোলিনির অপরিমেয় সেবার” জয়গান গেয়ে এবং তাঁর মতে কমিউনিসামের সর্বনাশ থেকে ইট্যালির রক্ষা কিভাবে ফ্যাসিবাদের দয়ায় হয় তা বুঝিয়ে বেশ কিছু চিঠি লিখেছিলেন। মিস্টার মনজিনি বম্বে প্রেসিডেন্সি ট্রেড্‌স এ্যাশোশিয়েসানের সদস্য ছিলেন, ইট্যালিয়ান টূরিং ক্লাব অফ বম্বের অধিনায়ক ছিলেন, এবং ১৯২৫ সালে স্থাপিত বম্বের ফ্যাসিবাদ সেন্টারের পরিচালক ছিলেন। খবরের কাগজে চিঠির মাধ্যমে আরেক পাঠকের সঙ্গে তর্কের মাঝে উনি স্পষ্ট লেখেন যে “এক দিকে ফ্যাসিবাদ নিয়মানুবর্তিতার হুকুম ও তথাকথিত স্বাধীনতার উপর বিধিনিষেধ স্থাপিত করলেও, অপর দিকে রাজ্যে শৃঙ্খলা ও অর্থনৈতিক ভারসাম্য সৃষ্টি করে।” ফ্যাসিবাদ যে সংবাদপত্রের স্বাধীনতা, সমাবেশের স্বাধীনতা এবং ধর্মঘট করার অধিকার কেড়ে নেয় সে কথা তিনি বিনা সংশয়ে মেনে নেন, কারণ তাঁর মতে রাজদ্রোহ এবং অপবাদ থেকে সরকারকে রক্ষা করার জন্য শাসনের “কড়া হাতের” প্রয়োজন। তা ছাড়া, ওনার মতে ফ্যাসিবাদ কেবলমাত্র একটি রাজনৈতিক দল নয়, বরঞ্চ সম্পূর্ণ দেশের পরিচয়- ফ্যাসিবাদই “ইটালিয়ান জাতির রূপ।”

Monginis Easter

টাইম্‌স অফ ইন্ডিয়া, ২৯ মার্চ ১৯২৯.

ফ্যাসিবাদের বিষয়ে মনজিনির কোন চিঠিতেই মনজিনি দোকানের নাম নেই, তবে চিঠিগুলির নিচে চার্চগেটের দোকানের ঠিকানা দেখে চেনা যায় যে দুই মনজিনি একই। অর্থাৎ যেই ব্যক্তিটির নাম সমস্ত বম্বে শহর ও ভারতবর্ষে মুখরোচক চকলেটের সঙ্গে পরিচিত ছিল, সেই একই ব্যক্তি মানতেন যে মুসোলিনির “দৃঢ় শাসনেই” ইট্যালির সমস্যার সমাধান খুঁজে পাওয়া যায়। ইতিহাস ও দ্বিতীয় বিশ্ব যুদ্ধের পথ অতিক্রম করার পর আজ মুসোলিনি বা ফ্যাসিবাদ দুটোর কোনটাই প্রকাশ্যে গর্বের কারণ না হতে পারে। তবে এক সময়ে অনেক মধ্যপন্থি লোকেরাও ফ্যাসিবাদ পছন্দ না করলেও বিশ্বাস করতেন যে ইট্যালির প্রতি মুসোলিনির অবদান সত্যি মহান। আজ থেকে আশি বছর আগে মনজিনি মহাশয়ের মতন বহু লোকই এই জিনিসগুলিকে সর্বপ্রধান মনে করতেন- জাতি ও দেশের শক্তি ও আধিপত্য, ফ্যাসিস্ট হিংস্রতার সকল সমালোচনাকে “অপবাদ” ও “রাষ্ট্রবিরোধী প্রচারণা” বলে দমন করা, এবং সমাজ ও শ্রমিকদের স্বাধীনতা বাতিল করে “ফ্যাসিবাদের রাজত্ব ও তার ডিউশ্‌” বা নেতার শাসন দৃঢ়তম করে তোলা।

মনজিনিসের নাম এখন মিয় আমরে। ইট্যালি বা ফ্যাসিবাদের সঙ্গে তার সম্পর্ক বহুকাল আগেই শেষ। স্বাধীনতার সময় দোকানটি বিক্রি করে দুই মনজিনি ভাই দেশ ছেড়ে চলে যান। তবে একবার ভেবে দেখবেন- আজকের জগতে এরম জিনিস বিশ্বাস করে এমন লোকদের কি আপনি চেনেন? তাদের পছন্দের “ইল ডিউশ্‌” বা নেতারা কারা?

Monginis orchestra

টাইম্‌স অফ ইন্ডিয়া, ১৩ মার্চ ১৯৩৪.

Scribbles: about stationery / হিজিবিজি: কাগজ-কলম সংক্রান্ত

Because not everything that catches my fancy in the archive is serious..

In Bibhutibhushan Bandopadhyay’s famous Bengali novel Pather Panchali, Apu as a young boy is once found sitting down to do homework. Much more engaging than the task of learning however, is the ink in his father’s inkstand, which glitters when he writes on paper with it. I don’t remember why the ink glittered so much- I read the book as a teenager. But the memory of an enthralled Apu filling page after page with lines, from the sheer joy of observing the black words glittering in the sun pouring into the uthon (porch) of a decrepit village house, remained etched in my mind.

10 years later, while dabbling in documents in the dark, dusty Maharashtra State Archives, that image floated up in front of my eyes. Seems like it wasn’t just little boys who liked glittery ink. Nor did glittery ink come into vogue with those Ad-gel pens of my teenage years. Apu of Nischindopur liked it, and so did thirty five year old Abdullah Sassoon of Bombay.

Sassoon ink

If the glitter of the ink looks faint, remember it is 161 years old. And you can still catch the twinkle of the ‘o’, even in a poor picture without adequate light. 

Abdullah David Sassoon was the older son of David Sassoon, the famous Baghdadi Jew of Bombay after whom Sassoon Dock in Mumbai today is named (they had it built). Here is a brief history of the Sassoons in their own words, taken from their letter of application for naturalization as British subjects in 1853:


Entrance to Sassoon Dock. Picture by author. 


David Sassoon Library. Picture by author. 

“That your Petitioner David Safsoon is about Sicty years of age and was born at Baghdad as well as his Two Sons Abdoolla David and Ellias David aged respectively the first thirty-five years and the last thirty three years and who all came to Bombay about Twenty years ago and have Since that time been trading in Bombay as merchants under the name, Style and firm of “David Safsoon and Company”.

That since their residence in Bombay they have acquired considerable moveable and immoveable property but by reason of their being aliens have experienced considerable difficulty at times in carrying out Speculations.”

Fascinating as the history of the Sassoons of Bombay are, I was rather taken with the minor fact of Abdullah’s preference for glittery ink. It is always a pleasure to imagine the real people behind the centuries’ old documents in our hands.

Take the following letter from the Khan of Janjira in 1848, for example:

Sidi letter

Janjira was an island-state in the Arabian Sea off the shore of Bombay, ruled by the Sidis (1618-1948) who were also called Habshees (since many of their ancestors were from Ethiopia or Al-Habash). Today all Indians of African descent are known as Sidis, but the history of Sidis in India is long, dispersed and varied.

Nawab of Janjira

Nawab Sidi Ahmed Khan of Janjira.     r. 1879-1922. The Kenneth and Joyce Robbins Collection. Courtesy of Schomberg Centre for Research in Black Culture.

In this letter the Nawab of Janjira is demanding the return of two absconding men from his island who had escaped to Bombay, which was then British East India Company territory. It is a bilingual letter, with a Persian introduction and the rest in Marathi, but both languages written in the same Modi script. Which is why it all looks the same to someone like me who cannot read Modi.

Once translated by someone who can, like historian Prachi Deshpande, there are many things of interest about this letter. And yet, I post it here for the reason that it first caught my eye- the beautiful (and incredibly fragile) gold foil decorated letter paper. Professor Deshpande says that in her experience such paper with gold or silver foil is frequently used for formal documents such as sanads or agreements, but not usually for a letter like this, which makes it all the more curious. Perhaps the quality of paper and handwriting, as evidence of the fact that the Sidi nawab took so much care over an ordinary letter, is a testament to the power of the British Company in the mid nineteenth century. Or, who knows, perhaps the Nawab of Janjira simply had a preference for beautiful stationery and a keen aesthetic sense?

With many thanks to Professor Prachi Deshpande for her help. 


আর্কাইভে যে শুধু গুরুগম্ভীর জিনিশেই চোখ পড়ে তেমন তো নয়..

পথের পাঁচালী উপন্যাসে মনে পড়ে, অপু একদিন পড়া করতে বসে বাবার দোয়াতের কালো কালিটা নিয়ে মুগ্ধ হয়ে যায়। পাতায় লিখলে উঠোনে পড়া রোদের আলোয় অক্ষরগুলো কেমন চকচক করে, সেই আনন্দেই বার বার কালিতে কলম ডুবিয়ে কালো অক্ষরে সে পাতা ভরিয়ে ফেলেছিল। বিভূতিভূষণের অসাধারণ ভাষায় আঁকা সেই মুহূর্তের ছবিটি মাথায় রয়ে যায়।

দশ বছর পর, মহারাষ্ট্র রাষ্ট্র মহাফেজখানার অন্ধকার ধুলোময় ঘরে ঐতিহাসিক দলিল ঘাঁটতে ঘাঁটতে সেই ছবিটি চোখের সামনে ভেসে ওঠে। হাতে আব্দুল্লাহ সাসুনের চিঠি। শুধু নিশ্ছিন্দপুরের অপু, বা উনবিংশ শতাব্দীর অ্যাড-জেল কলম ধরা কিশোর-কিশোরীরা কেন, ১৮৫৩ সালে পঁয়ত্রিশ বছরের আব্দুল্লাহ সাসুনও চকচকে কালি পছন্দ করতেন।

Sassoon ink

কালির চিক্‌চিকটা যদি আবছা মনে হয়, তাহলে মনে রাখবেন যে সইটা ১৬১ বছর পুরনো। তবুও ক্ষীণ আলোয় তোলা ছবিতেও সাসুনের ‘o’এর চমক বেশ দেখা যাচ্ছে। 

বম্বে শহরের বিখ্যাত বাগদাদি-ইহুদি ব্যবসাদার ডেভিড সাসুনের বড় ছেলে ছিলেন আব্দুল্লাহ সাসুন। দক্ষিণ মুম্বাই-এর সাসুন ডক এই পরিবারের নামেই নামিত (তাঁদের অর্থ সাহায্যে ফেরিঘাটটি তৈরি হয়)। ১৮৫৩ সালে ডেভিড সাসুন সপুত্র ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের প্রজা হিশেবে স্বাভাবিকরণের আবেদনে চিঠি লেখেন। সেই চিঠিরই ভাষায় সাসুনদের সংক্ষিপ্ত ইতিহাস-


সাসুন ডকের প্রবেশদ্বার। ছবি লেখকের তোলা। 

“আপনার আবেদক ডেভিড সাসুনের বয়স ষাট বছর, জন্ম বাগদাদে। তাঁর দুই পুত্র আব্দুল্লাহ ডেভিড এবং এলিয়াস ডেভিড, বয়স পঁয়ত্রিশ ও তেত্রিশ। প্রায় বিশ বছর আগে তাঁদের সবার বম্বে শহরে আগমন এবং সেই সময় থেকেই তাঁরা “ডেভিড সাসুন অ্যান্ড কোম্পানি” নামের মাধ্যমে বম্বে থেকে বাণিজ্য করে এসেছেন।

বম্বে তে বাস করা কালীন তাঁরা বেশ কিছু অস্থাবর ও স্থাবর সম্পত্তি অর্জন করেছেন কিন্তু বিদেশি হওয়ার কারণে লাভের উদ্দেশে লগ্নি করার বিষয়ে প্রায়েই অসুবিধার সম্মুখীন হয়েছেন।”


ডেভিড সাসুন লাইব্রেরি। ছবি লেখকের তোলা।

বম্বের সাসুনদের ইতিহাস খুবই চিত্তাকর্ষক। তবে সেইদিন আব্দুল্লাহর চকচকে কালির সইয়ের মতন সামান্য জিনিশের প্রতিই নজর পড়ল। কয়েকশ বছর পুরনো কাগজ-পত্র হাতে ধরে সেগুলির ঐতিহাসিক স্রষ্টাদের ব্যক্তিত্বের বিষয়ে কল্পনা করতে বেশ লাগে।

যেমন ধরুন ১৮৪৮ সালের জাঞ্জিরার খানের লেখা এই চিঠি-

Sidi letter

বম্বে শহর থেকে অল্প দুরে আরব সাগরে জাঞ্জিরা নামক এক দ্বীপ-রাষ্ট্রে ছিল সিদিদের রাজত্ব (১৬১৮- ১৯৪৮)। সিদিদের হাবশী নামেও চেনা যেত, কারণ তাঁদের অনেকের পূর্বপুরুষেরা ইথিওপিয়ার বা আল-হাবাশ-এর বাসিন্দা ছিলেন। আজ আফ্রিকান বংশদ্ভুতের সকল ভারতবাসীদেরকে সিদি বলে ডাকা হয়, কিন্তু ভারতবর্ষের সিদিদের ইতিহাস ভীষণই দীর্ঘ ও বিচিত্র।

Nawab of Janjira

জাঞ্জিরার নবাব সিদি আহমেদ খান, র.১৮৭৯-১৯২২। কেনেথ্‌ অ্যান্ড জয়েস রবিন্স কালেকশান। সৌজন্যে শম্বার্গ সেন্টার ফর রিসার্চ ইন ব্ল্যাক কালচার। 

এই চিঠিতে জাঞ্জিরার নবাব ইংরেজ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি প্রশাসনকে জানিয়েছেন যে তাঁর দুই অপরাধী প্রজা বম্বেতে পলায়ন করেছে, এবং তাদের যেন জাঞ্জিরায় ফিরিয়ে দেওয়া হয়। চিঠিটা দু ভাষায় লেখা- ভূমিকা ফারসিতে এবং বাকিটা মারাঠিতে- কিন্তু দুটি ভাষাই এক মোদি লিপিতে লেখা। তাই, আমার মতন যারা মোদি পড়তে পারেন না, তাঁদের চোখে এই পার্থক্যটি ধরা পড়বে না।

মোদি পড়তে জানেন এমন কোন ইথিহাসবীদ, যেমন প্রাচী দেশপাণ্ডে, চিঠিটা পড়ে দিলে নানান গুরুত্বপূর্ণ বিষয় চোখে পড়ে। তবে এইখানে চিঠিটার ছবি আজ লাগাচ্ছি ভাষা বা লিপির আলোচনা করার জন্য নয়। প্রথম দিন চিঠিটা দেখে সোনার পাত দিয়ে সাজানো কাগজখানি খুব সুন্দর (ও সূক্ষ্ম) লেগেছিল। প্রফেসার দেশপাণ্ডে বললেন যে ওনার অভিজ্ঞতায় এই ধরনের সোনা বা রুপোর পাত দিয়ে সাজানো কাগজ সাধারণত সরকারি দলিলে ব্যবহার করা হত, যেমন ধরুন সনদ বা চুক্তিতে। সাধারণ একটি চিঠিতে এই প্রকারের কাগজের ব্যবহার তাই আরোই কৌতূহলজনক। সিদি নবাবের চিঠিতে সুন্দর কাগজ ও হাতেরলেখার প্রতি এই মনোযোগ হয়ত মধ্য উনবিংশ শতাব্দীতে ইংরেজ কোম্পানির ক্ষমতা ও মর্যাদারই এক চিহ্ন। কিংবা, কে জানে, হয়ত ক্ষমতা নয়, শিল্পকলার স্বার্থেই জাঞ্জিরার নবাব দৃষ্টিনন্দন কাগজকলমের প্রতি আগ্রহী ছিলেন?

প্রফেসার প্রাচী দেশপাণ্ডে কে সাহায্যের জন্য অনেক ধন্যবাদ। 

What’s in a seal?/ সীলমোহরে আছে কি?


Document with seal from a boundary dispute in Chota Nagpur. © The British Library Board, IOR/L/PS/6/549, Coll 43: Aug 1855-Dec 1866

It is rare in the British Library, London, for a file to be misnumbered. But it so happened that once while trying to study Bombay I found myself looking through a file of papers on Chota Nagpur, 1855-1866, due to a filing error. There, I encountered the above pictured seal from the Commissioner’s office, stamped on every page of a boundary dispute. But why is it interesting?

A seal not only serves the purpose of securely closing something (a letter or a good) but is also a stamp of authority, authorship or ownership. In fifteenth century England the king’s secret seal (the signet) and the privy seal were important enough that they were guarded by those closest to the king, his secretary and the keepers who travelled abroad with him, while in 1628 portraits of the Mughal Emperor Shah Jahan featured him holding the royal seal inscribed with his titles.

Shah Jahan with seal

Shah Jahan holding his seal engraved with his imperial titles, dated 1628. BM 1969.3-17.01. © Lasting Impressions,  British Museum and British Library



Seal of the Fishmongers of Bruges. Archives Nationales (Paris) F4757. © University of Notre Dame, Medieval Institute Library

From emperors to popes and qazis, fishermen’s guilds in medieval Europe to scribes and traders in nineteenth century Egypt, seals have been used widely by many since ancient times as stamps of authenticity and authority.

A seal stamp found on archival documents is therefore is not simply a symbol of power, a decoration, but also a source for studying where historical figures and institutions drew their authority and power from. The Mughal Emperor Shah Alam II’s seal (r. 1759-1806) for example, starts with an invocation of God at the top, and goes on to consecrate the emperor’s name in Persian amidst a constellation of the seals of his ancestors (see the fourteen little circles surrounding the large central circle?). Authority rests therefore not only in God, but also in the emperor’s illustrious genealogy. But now look at the English East India Company seal made during the reign of this same emperor- it tells us something more than the names of figures in whom authority is vested. It illustrates why language is an important tool of power. Why else would a British company issue a seal in the Persian language?

Shah Alam's seal

Genealogical seal of the Mughal emperor Shah Alam II, from an illuminated manuscript, dated 1173/1759


EIC seal

Silver seal of English East India Company, dated 1180/1766. BM 1970 3-9 1. © British Museum

In 1766 the East India Company was just a trading company with the unusual power to collect revenue from land granted to it by the Mughal sovereign. In this seal the company declares this power not in English, its native language of operation, but in Persian (nastaliqh script), the language of administration and power in Mughal South Asia, adopting the elaborate style of referring to selves and important others by grand titles: “The Honorable, the Chief of the Merchants, the English Company, Controller of Finance of the Noble Exchequer of the provinces of Bengal, Bihar and Orissa, humble servant of Shah ‘Alam, the Emperor and Warrior for the Faith” (English translation courtesy Lasting Impressions exhibition brochure, Annabel Teh Gallop, British Library and Venetia Porter, British Museum, 2010). Look closely at the topmost line on both seals. Even if you cannot read Persian, you may be able to note that both lines are identical. They read “Shah Alam Badshah e Ghazi”- the imperial title of Shah Alam. Interestingly, the date on the English Company seal is the Hijri date (1180) also used by Mughals at the time and not the Gregorian calendar the British used themselves (1766). In content, style and metaphor we have here a trading company closely imitating an emperor and a particular tradition of power.

Power lies therefore not only in whom you draw authority from, but in the language (and style) in which you speak. For example, in 1809 a compendium of linguistic directions to young Englishmen in India (Dialogues, John Gilchrist) instructed them to always address natives (all of whom appear in the work as servants) with brief commands. To address someone with “suno” and add single words like “plate” was more commanding than full sentences like “give me a plate”, which did not sound authoritative enough. In much the same way, this Chota Nagpur seal from 1854 uses language as a tool for enforcing relations of power.


Seal of Commissioner’s Office, Chota Nagpur, dated 1854. © The British Library Board, IOR/L/PS/6/549, Coll 43

The seal is inscribed in five languages- English, Bengali, Hindi, Oriya and Urdu. Writing about the languages spoken in the Chota Nagpur division (Bengal Province), the Imperial Gazetteer (1907) says that tribal populations (Santhal, Ho, Gond, Munda, Oraon) of the province were “gradually abandoning their tribal dialects in favour of … Hindi to the north and west, Oriya to the south and Bengali to the east, but a large number still [spoke] their own languages”. Persian was substituted by Urdu as the language of administration in the northern provinces of India in 1837. It is interesting that atleast in this section of the Bengal province Urdu seems to have been officially in use too. The most detailed part of the inscription on this seal is in Urdu and it reads (barring one word that is too faint to read), “San-é 1854 Eeswi, Kachheriye Sahib Commissioner, Chota Nagpur” (Year 1854 Christian era. Office of the Master Commissioner, Chota Nagpur).

Most interestingly however, while in English the post is named “Commissioner of Chota Nagpur”, in Hindi, Bengali, Persian and presumably Oriya too (I cannot read Oriya), it is named “Sahib/Shaheb Commissioner Chota Nagpur”. Just as the Englishman must never speak to the native in a polite sentence as one would with an equal, but always in the tone of command, the Indian must always refer to the Englishman in power in a tone of reverence, as “sahib” or “master”. Whatever be the official authorities and ideologies in which power may claim to locate its source, language was (and is) one of the essential means for the daily exercise of domestic and state power. Therefore, knowing a language was power, and using or refusing to use a language in a particular way could amount to a challenge of power.

If you would like to read more about the relation of power with language and its history in South Asia, read “Languages of Command and the Command of Language” by Bernard Cohn (note: full text is not available on Google books).

Before I end, many many thanks to Dr. Nandini Chatterjee, and my friend Zeinab Azarbadegan, for their kind and enthusiastic help in deciphering blurry Urdu and Persian inscriptions, and to Baba, for editing my Bengali text.



জমি তর্কের পাতায় সীলমোহরের ছাপ, ছোট নাগপুর, © ব্রিটিশ লাইব্রেরি বোর্ড, IOR/L/PS/6/549, Coll 43, ১৮৫৫-১৮৬৬।

লন্ডনের ব্রিটিশ লাইব্রেরিতে সাধারণত নথিপত্রের নম্বরে খুব একটা ভুল হয় না। তবে মাঝে মধ্যে নিশ্চই হয়, তাই এক দিন বম্বে শহরের কিছু কাগযের জন্য নিবেদন পত্র ভরে হাতে পেলাম একটি ছোট নাগপুরের ফাইল। সেই ফাইলেই দেখলাম ছোট নাগপুরের কমিসনর আপিসের এই সীলমোহরের ছাপ, একটি জমি তর্কের সরকারি কাগজের প্রতিটি পাতায়। তবে এই সীলমোহরটিতে আলোচনা করার মতন আছে কি?

সীলমোহর দ্বারা শুধু মাত্র যে খোলা জিনিশ (চিঠি বা মালপত্র) ছাপ সহ বন্ধ করা যায় তা নয়। প্রতিটি সীলমোহরে থাকে কারুর কর্তৃত্ব, কৃতি অথবা মালিকানার ছাপ। পনেরই শতাব্দীর ইংল্যান্ডে রাজার গোপন সীলমোহর (সিগনেট) ও রাজকীয় সীলমোহর থাকত কেবল রাজার ঘনিষ্ঠ মন্ত্রীদের জিম্মায়- সচিব এবং বিদেশ যাত্রায় রাজার রক্ষকদের কাছে; এদিকে ১৬২৮ সালে মুঘল সম্রাট শাহ জাহানের প্রতিকৃতিতে তাঁকে হাতে সীলমোহর সহ দেখা যায়।

Shah Jahan with seal

শাহ জাহানের হাতে বাদশাহি উপাধি সহ সীলমোহর, ১৬২৮। BM 1969.3-17.01 © ব্রিটিশ মিউজিয়াম ও ব্রিটিশ লাইব্রেরি


ব্রুজেসের মাছের ব্যবসায়ীদের সীলমোহর। Archives Nationales (Paris) F4757. © নটর ডাম বিশ্ববিদ্যালয়, মধ্যযুগীয় ইন্সটিটিউট লাইব্রেরি 

সম্রাট থেকে পোপ বা কাজি, মধ্যযুগীয় ইউরোপের মাছওয়ালাদের সংস্থা থেকে উনবিংশ শতাব্দীর মিশর দেশের লিপিকার ও ব্যবসায়ী অবধি, আদিম যুগ থেকে পৃথিবীর বহু লোক কর্তৃত্ব ও প্রামাণিকতার চিহ্ন হিসেবে সীলমোহরের উপযোগ করে এসেছে।

তবে আর্কাইভের পাতায় খুঁজে পাওয়া সীলমোহরের ছাপ ঐতিহাসিকের কাছে কেবলমাত্র একটি চিহ্ন বা অলঙ্কার নয়। সেগুলি ঐতিহাসিক ব্যক্তিদের ও প্রতিষ্ঠানের কর্তৃত্ব ও ক্ষমতার উৎস চেনার উপায়। যেমন দেখুন, মুঘল সম্রাট শাহ আলমের (১৭৫৯-১৮০৬) সীলমোহরে সব থেকে উপরে ঈশ্বর কে আবাহন করা; তারপর মাঝখানের বড় বৃত্তের ভেতের সম্রাটের নাম ও উপাধি ফারসি ভাষায় লেখা, ও সেটিকে ঘিরে চোদ্দোটি ছোট চক্রে তাঁর পূর্বপুরুষের নাম। অর্থাৎ, বাদশাহী আধিপত্যের অধিকারের উৎস বলে এইখানে দুটি জিনিশ চিহ্নিত- ঈশ্বর, ও সম্রাটের প্রসিদ্ধ বংশতালিকা। এই বার, ইংরেজ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির সীলমোহরটি দেখুন, সেইটিতে কর্তৃত্ব দাতার নামের চেয়ে আরো বেশি কিছু জানা যায়। ক্ষমতার যন্ত্র হিশেবে ভাষার গুরুত্ব বুঝতে পারা যায়। তা না হলে একটি ইংরেজ প্রতিষ্ঠানের সীলমোহরে ফারসি ভাষায় লিপি কেন থাকবে?

Shah Alam's seal

রঙিন পাণ্ডুলিপি থেকে মুঘল বাদশা শাহ আলমের বংশতালিকা সহ সীলমোহর, সাল ১১৭৩/১৭৫৯।

EIC seal

ইংরেজ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির রুপোর সীলমোহর, সাল ১১৮০/১৭৬৬। BM 1970 3-9 1. © ব্রিটিশ মিউজিয়াম

১৭৬৬ সালে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি পরিচয়ে একটি বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান মাত্র হলেও, তাঁদের হাতে ছিল মুঘল সম্রাট দ্বারা প্রদত্ত জমি থেকে খাজনা আদায় করার অধিকার। এই অদ্ভুত ক্ষমতার ঘোষণা করেই এই সীলমোহরটি বানানো। তবে ঘোষণাটি তাঁদের ভাষা ইংরিজি তে নয়, মুঘল দক্ষিণ এশিয়ার প্রশাসন ও প্রতিপত্তির প্রধান ভাষা, ফারসি তে। মুঘল বাদশাদের মতনই মহান ও সম্প্রসারিত উপাধি সহ, ফারসি ভাষার নাস্তালিখ হস্তলিপি তে কোম্পানির নাম এবং অধিকার অঙ্কিত- “মাননীয়, মুখ্য ব্যাপারী, ইংরেজ কোম্পানি, বঙ্গ, বিহার ও উড়িষ্যা প্রদেশের উন্নত কোষাগারে অর্থ নিয়ন্ত্রক, সম্রাট ও বিশ্বাসের যোদ্ধা শাহ আলমের নম্র সেবক”। সীলমোহর দুটির উপরের লাইন গুলো মন দিয়ে দেখুন। ফারসি পড়তে না পারলেও বুঝতে পারবেন যে লেখা দুটি সম্পূর্ণ অভিন্ন। লেখা, “শাহ আলম বাদশা এ ঘাজি”- শাহ আলমের সাম্রাজ্জিক উপাধি। মজাদার বিষয় হল যে ইংরেজ সীলমোহরেও সেই কালের মুঘলদের মতন হিজরি পাঁজির তারিখ লেখা (১১৮০), ইংরেজ দের গ্রেগরিয়ান পাঁজি অনুযায়ী (১৭৬৬) নয়। অর্থাৎ পরিচয়ে বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান হলেও, কোম্পানির বক্তব্য, কায়দা ও ভাষার রূপক কিন্তু ঠিক সম্রাটের মতন, ক্ষমতার একটি বিশেষ প্রথার অনুকরণ।

ক্ষমতার উৎস তার মানে কেবলমাত্র কোন ব্যক্তিত্ব বা ঈশ্বরের নামে হয় না, কথা বলার ভাষা ও ধরনের মাধ্যমেও হয়। এই ধরুন ১৮০৯ সালে জন গিলক্রিস্ট “ডাইলগ্‌জ” Dialogues নামক একটি বই লেখেন, ভারতবর্ষে তরুণ ইংরেজদের সাহায্য করার উদ্দেশে। লেখক বলেন যে ভারতীয় “নেটিভ”এর সঙ্গে কথা বলার জন্য (তাঁর বইতে অবশ্যই এই নেটিভ রা সবাই চাকর) শুধু “সুনো” বা “শোন” শব্দে ডাকা উচিত। আর কিছু প্রয়োজন হলে এক কথায় হুকুম করা উচিত, পুরো বাক্যের প্রয়োজন নেই। কারণ “একটা প্লেট দাও” বললে যথেষ্ট শাসন-ক্ষমতা সম্পন্ন শোনায় না- “শোন! প্লেট!” বলাটাই ইংরেজ কর্তার পক্ষে বাঞ্ছনিয়। ঠিক সেই ভাবেই, ১৮৫৪ সালের ছোট নাগপুরের এই সীলমোহরটিও ক্ষমতার সম্পর্ক বাঁধিয়ে রাখার জন্য ভাষাকে যন্ত্র হিশেবে ব্যবহার করে।



কমিশনর দফতরের সীলমোহর, ছোট নাগপুর, সাল ১৮৫৪। © ব্রিটিশ লাইব্রেরি বোর্ড, IOR/L/PS/6/549, Coll 43

সীলমোহরটিতে পাঁচটি ভাষায় লেখা- ইংরিজি, বাংলা, হিন্দি, উড়িয়া ও উর্দু। ১৯০৭ সালের ইম্পেরিয়াল গ্যাজেটিয়ার এ লেখা আছে যে বঙ্গ প্রদেশের ছোট নাগপুর বিভাগের আদিবাসী জনগণের (সাঁওতাল, গোণ্ড্‌, হো, মুণ্ডা, ওরাওঁ) অনেকেই “ক্রমশ নিজেদের আদিবাসী উপভাষা ছেড়ে… উত্তর ও পশ্চিমে হিন্দি, দক্ষিণে উড়িয়া, ও পূর্বে বাংলা ভাষা ব্যবহার করে, কিন্তু তবুও অনেকেই নিজেদের ভাষায় কথা বলে।” ১৮৩৭ সালে ভারতের উত্তর প্রদেশগুলিতে প্রশাসনের ভাষা হিশেবে ফারসি ভাষার বদলে উর্দু ভাষার প্রচলন করা হয়। তবে সীলমোহরটি দেখে মনে হয় যে উত্তরের বাইরেও, অন্তত বঙ্গ প্রদেশের এই অংশে, ১৮৫৪ সালে উর্দুর সরকারী ব্যবহার ছিল। মোহরটির লিপির সব থেকে বিশদ অংশ হচ্ছে উর্দু ভাষায় লেখা (একটি শব্দ মাত্র স্পষ্ট পড়া যাচ্ছে না)- “সন-এ ১৮৫৪ ঈশভি, কাছেরি-এ সাহিব কমিশনর, ছোটা নাগপুর” (১৮৫৪ সাল খ্রীষ্টান যুগ, সাহেব কমিশনরের দফতর, ছোট নাগপুর)।

সব থেকে কৌতূহলের বিষয় এই যে ইংরিজি তে যেই পদটির নাম “কমিশনর ছোট নাগপুর”, বাংলা, হিন্দি, উর্দু, এবং খুব সম্ভবত উড়িয়াতেও (উড়িয়া ভাষা আমি পড়তে জানি না), সেই একই পদের নাম “সাহেব কমিশনর ছোট নাগপুর”। ভারতীয় প্রজার উদ্দেশ্যে ইংরেজের মুখে সমমর্যাদাপূর্ণ উপাধি মানানসই হয় না, কেবল হুকুমের স্বর উপযুক্ত বলে গেছেন গিলক্রিস্ট। ঠিক তেমনই ইংরেজ শাসক কে সম্বোধন করার জন্য ভারতীয় “নেটিভ” মালিকের দরজা দিয়ে “সাহেব” বলে ডাকবে, সেটাই প্রত্যাশিত। ক্ষমতার ধারক সরকারি ভাষায় যেই কর্ত্রীপক্ষ বা মতাদর্শকেই উৎস বলে জানাক না কেন, ভাষা হচ্ছে সরকারি ও গার্হস্থ্য ক্ষমতার দৈনন্দিন অনুশীলনের একটি অপরিহার্য যন্ত্র। সেই কারণেই, একটি ভাষা জানা মানে হচ্ছে ক্ষমতার ধারক হওয়া, এবং ভাষার নির্দিষ্ট প্রয়োগ করা বা না করার মাধ্যমে ক্ষমতার প্রতি আপত্তি জানানর রাস্তা।

দক্ষিণ এশিয়ায় ভাষা ও ক্ষমতার সম্পর্ক এবং ইতিহাসের প্রতি আরো কৌতূহল থাকলে, বার্নার্ড কোহ্ন এর “Languages of Command and the Command of Language” প্রবন্ধ টি পড়ুন (Google Books এ প্রবন্ধটির অংশ মাত্র পড়া যায়)।

শেষ করার আগে, দুরূহ ও অস্পষ্ট উর্দু এবং ফারসি লেখা পড়ায় সাহায্য করার জন্য ডাক্তার নন্দিনী চ্যাটার্জি ও আমার বন্ধু যেইনব আযারবাদেগান কে অনেক ধন্যবাদ, এবং বাবাকে, বাংলা লেখার সম্পাদনার জন্য। 

Archivenama? What’s that? / আর্কাইভনামা? সে আবার কি?

Archives are like cities. Some are meticulously planned, destinations easily identifiable by street and avenue intersections, like New York. Others, a jumble of roads and alleys that Google Maps can’t fully get a grip on, like Kolkata. You set out to navigate its streets and lanes with a handful of historical questions to lead you, sifting through the voices at every door. There are the ones that you listen carefully to, and uncountable others that you put aside or never get wind of. And as often as (sometimes more often than) you arrive at addresses with the stories that help you fit a piece of the larger puzzle you have set yourself as a historian, you also arrive at dead ends or walk into unexpected lives.

I am a fourth year PhD student of history, and I have been collecting nuggets from archives in a few places across the world intermittently for a few years now, learning how to use them to answer historical questions, mostly about the nineteenth and twentieth centuries in South Asia and the Indian Ocean world. But the more time I spend in archives, the more I am struck by the peripheral discoveries. That is to say, not the details that I am likely to use to answer the questions in my dissertation, but ones that are fascinating and illuminating nevertheless. Often, while trying to attend to furious debates between merchants and the government, I will be sidetracked by reports of a doomed love affair between an Indian lawyer and a British woman. Or the peculiarities of a bilingual, trade union rulebook will occupy me when I ought to be scrutinising the list of pensioners at the Bombay port. What, then, should become of these stories?

Hence, Archivenama. In the style of Akbarnama or the Book of Akbar, you may call it the Book of Archives, or like a safarnama (travelogue) it can be an archival (web)log. As Pablo Neruda wrote in his memoirs, I will not write about these historical moments in a chronological order of discovery, as a conventional log may expect, but in the order that they come to my mind, like the waves of the sea. The content of every post, however, will not be grounded in the context of my whims but that of history. Perhaps some people will have from this, a glimpse (a very small, partial glimpse) of the ore that we work with as historians digging away in the mysterious place called the archive. Perhaps some will see the questions that we put to our sources and how knowledge is as much about selection and organization of facts as about discovery. Or perhaps whoever reads this blog will do so only because the snippets it shares are entertaining. Whichever be the case, these stories would do well to breathe outside the air of the archive and the dissertation. So it is here that they will keep coming as I continue on my year of research for my PhD.

And why blog in two languages? Because one of the many things that studying South Asian and Indian Ocean history has imbued me with is a sense of the spectacular multilinguality of our existence- everyday and intellectual- and simultaneously the fast depleting ability or desire of many of my peers in India to write well in languages other than English. I number myself among those who never learned to write well enough in Bangla, and I hope to learn to do it better, as I write. This is where I start.


সব মহাফেজখানা বা আর্কাইভই শহরের মতন। কোনোটা অতিসতর্ক ভাবে পরিকল্পিত, নিউ ইয়র্কের মতন দুই আড়াআড়ি রাস্তার নাম জানলেই সহজে গন্তব্য স্থান খুঁজে পাওয়া যায়। আবার কোনোটা কলকাতার মতন এলোমেলো, যার গলি ও সড়কের রহস্য এখনো গুগল্‌ ম্যাপ্‌স এর প্রযুক্তিবিদ্যার ছোঁয়ার বাইরে। ঠিক শহরের মতনই আর্কাইভের রাস্তায় ঐতিহাসিকের বেরিয়ে পড়া- সামনে ইতিহাসের কিছু প্রশ্ন, ও দরজায় দরজায় শোনা স্বরের ভীড় ছেঁকে, পথ বেছে, উত্তরের খোঁজে চলা। নানান রাস্তায় নানান গল্প মন দিয়ে শোনা, কিছু গল্প সরিয়ে রাখা, এবং কতকগুলির খোঁজই না পাওয়া। এইভাবে হেঁটে কখনো কখনো রাস্তা গুরুত্বপূর্ণ তথ্যের ঠিকানায় পৌঁছায়, কিন্তু প্রায়েই কাণাগলি অথবা অপ্রত্যাশিত কিছু জীবন কাহিনীর মাঝে গিয়ে পড়ে।

আমি একজন চতুর্থ বর্ষের পিএইচডি ছাত্রী। বিগত কিছু বছর ধরে নানান আর্কাইভে ঐতিহাসিক প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে শিখছি, সাধারণত উনবিংশ ও বিংশ শতাব্দীর দক্ষিণ এশিয়া ও ভারত মহাসাগরের জগতের বিষয়ে। আর্কাইভে যত বেশি পড়ি, ততই যেন সীমান্তবর্তী গল্পগুলির চমক বেশি চোখে পড়ে। সীমান্তবর্তী বলতে যেই তথ্যগুলির উল্লেখ আমার পিএইচডির নিবন্ধে খুব সম্ভবত থাকবে না, অথচ যার ইতিহাস নিতান্তই চিত্তাকর্ষক ও জানার মতন। কখনো কাজের মাঝে, সরকার ও বণিকদের তুমুল তর্কের গুরুত্তপূর্ণ খুঁটি নাটি ছেড়ে কোন এক ইংরেজ মহিলা ও ভারতীয় উকিলের জটিল প্রেম কাহিনীর রিপোর্টে গিয়ে চোখ পড়ে। বা, বম্বাই বন্দরের পেনশনভোগীদের তালিকা খুঁটিয়ে দেখার কাজ ফেলে, বন্দরের শ্রমিক সমিতির দ্বিভাষিক নিয়মাবলির অদ্ভুত কায়দা নিয়ে ভাবি। এই ধরনের গল্পগুলির হবে কি?

সেই কথা মাথায় রেখেই, আর্কাইভনামা আকবরনামা বা ‘আকবরের বই’ এর অর্থে, আর্কাইভনামা কেও ‘আর্কাইভের বই’ বলে বুঝতে পারেন। কিংবা সফরনামা বা ভ্রমণ কাহিনীর মতন আর্কাইভের ভেতর আমার যাত্রার বিবরণ হিশেবেও দেখতে পারেন। গল্পগুলি আর্কাইভে আবিষ্কারের কালানুক্রম অনুসারে গুছিয়ে আমি লিখব না; পাব্লো নেরুদা যেমন নিজের স্মৃতিকথায় লিখেছিলেন, মনে যেই অনুক্রমে চিন্তা আসবে, সমুদ্রের ঢেউয়ের মতন, সেই ক্রমেই লিখব। তবে অবশ্যই ঐতিহাসিক প্রসঙ্গের খেয়াল রেখে লিখব, খামখেয়ালি ভাবে নয়। হয়তো কিছু লোক এই ব্লগ পড়ে আর্কাইভ নামক রহস্যময় জায়গাটির ভেতরে ইতিহাসের খনিজ পদার্থের এক ঝলক (খুব ছোট্ট একটি ঝলক) দেখতে পাবেন। কেউ হয়তো ঐতিহাসিকের প্রশ্ন করার ধরনের কিছু উদাহরণ পাবেন, এবং জ্ঞান অর্জন মানেই যে কেবল তথ্যের সন্ধান পাওয়া নয়, তথ্যের নির্বাচন করা ও সাজানোও, সেই ধারণা পাবেন। অথবা হয়তো যারাই এই পোস্টগুলি পড়বেন, গল্পগুলো রসালো বা মনোরম মনে করেই পড়বেন। সে যে কারণেই হোক, এই ঐতিহাসিক মুহূর্তগুলি আমার টিকার মার্জিন ছেড়ে আর্কাইভের বাক্সের বাইরের হাওয়া খেলে বেশ হয়। তাই আগামী এক বছরের আর্কাইভ চর্চা করা কালীন এইখানেই সেই গল্পগুলির হদিশ পাওয়া যাবে।

আর দু ভাষায় ব্লগ লেখা কেন? কারণ দক্ষিণ এশিয়া ও ভারত মহাসাগরের ইতিহাস পড়ে, বহু জিনিসের মধ্যে, আমাদের অসাধারণ বহুভাষিক অস্তিত্বের এক চেতনা হয়। অথচ ভারতবর্ষে আমাদের প্রজন্মে ইংরিজি ছাড়া অন্য কোন ভাষায় ভালো লিখতে পারা যেন ক্রমশই কম গুরুত্বপূর্ণ হয়ে চলেছে। বাংলায় লেখার হাত আমারও যথেষ্ট পাকা নয়, লিখতে লিখতে শিখতে চাই। তাই, এখান থেকেই শুরু।